শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮

অসুখপোঁকা

থার্মোমিটারের পারদ উড়তে উড়তে
বিষাদের মহাশূন্য ছুয়ে এলো।
নীল নীলে জলের লেখা,
এ তপ্ত দুপুরে, প্রতিটা মানুষ একা।

হু হু বাতাস বুকের ভাঁজ ভাঙে,
ঢেউ তোলে, এলোমেলো চুলে,
নোংরা শরীর পুড়ে শুদ্ধ হয়।
খাণ্ডবদাহন নাচে খুলির ভেতরে।

আস্তে আস্তে সব ঘোলা।
তুমি, আমি, অতীত ও ভবিষ্যৎ,
মাঝে মাঝে, ক্লান্ত ব্যাথার ঝড়ে,
দু'চোখে কষ্টের অসুখপোঁকা পড়ে।


আধঘুম নীল রঙ নারকোলের পাতায়,
শৈশবের বিস্মৃত সুর কাপে মাতাল হাওয়ায়,
আড়ালে রাখা চোখ মাখে স্বপ্নের সাদাকালো। 
এই মরার শহরে আমি ভালো নাই। তুমি ভালো?




সোমবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

চন্দ্রগ্রহণ

চন্দ্রগ্রহণ দেখবো বইলা উঠলাম ছাদে
মাথার ভিতরে গান হয়, বাইরে ওয়াজ।
কি নোংরা দাঁতাল শুয়োরের আওয়াজ।
আমরা ছিপিতে ছিপিতে মদ মাপি
আর চুমুক দিয়া খাই অক্লান্ত বিদ্রোহ
বাউলা মনের জ্যোৎস্নায় ভাসা দোতারা
অতীতে তোলে টংকার আর জানান দেয়
দ্রাবিড় রক্তের নিষিদ্ধ কোমল ক্রোধ।

মাটির গভীরে যে সুর তোমরা পুতবা
তার কবর থেকে উঠবে আদিম সোমরস।
তার গন্ধে মাতাল হয়ে যাবে সময়
আমাদের যতই টানবা আলোকিত অন্ধকারে
আমরা ডুবে যাবো বিষণ্ণ চাঁদের আলোয়।

বৃহস্পতিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৮

ঈশ্বরের বাসস্থান

তার জন্ম হোলো অন্ধকারের যোনি ছিড়ে
তিনি কেঁদে উঠলেন, সবাক হোলো বাতাস।
অন্ধকারের শরীর তাকে ঘিরে শীতল তখনো
তিনিই তৈরি করলেন আলো আর আকাশ।

এক এক চিৎকারে বয়ে গেলো তারার স্রোত,
তিনি তখনো কাঁদছেন, কোথাও কেউ নেই।
শেষমেষ নামহীন নক্ষত্রে অম্বুজ জন্ম শেষে,
এক সালংকারা সসাগরা করলেন পৃথিবীকে।
সে কুমারী তাকে নরম বুকে রাখলেন জলজ ওমে।

বাতাসে রেশম চুল উড়লো, তিনি হাসলেন।
জন্ম হলো গান, তিনি আনন্দে মাথা দোলালেন,
নেচে উঠলো আসমুদ্রহিমাচল জীব আর জড়।

যেখানে জন্মে সমস্ত স্থলজ কাম ও ক্রোধ,
হিংসা আর সংগমে ক্লান্ত বিধ্বস্ত অতীত,
বিষাদে বিষণ্ণ মাটির সর্বংসহা আশ্রয়
সেখানে ঈশ্বর জন্মাননি কোনদিন।
তিনি বারবার জন্মান আত্মার গভীরে
তিনি থাকেন বিশাল সমুদ্রের অতলে,
দুঃখী আকাশ আর করুণ প্রেমিকের হৃদয়ে। 

সোমবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৭

অসুখলতার ফুল

অদৃশ্য দাবাড়ুরা বসে চালে,
ঘোড়া হাতি রাজা মন্ত্রী নৌকা আর বোড়ে।
বোড়েকে কারা যেন বলে সৈনিক!
কিসব তুচ্ছ গালভরা নাম বলতো?
এক দুজন মন্ত্রী হয়, বাকিরা পরাজিত।

অবাক এক ধরনের ক্লান্তি আছে বলে,
এইসব পার্ক, অলিগলি আর ময়লা রাস্তা
পার হতে হতে হেসে ফেলি অযথাই।
মানুষগুলো মনে হয় সাদাকালো প্ল্যাকার্ড,
সবার গায়ে দুঃখের অদৃশ্য আঁকিবুকি।

আমি আর আমরা যারা সময় গুড়ো করে,
একটু একটু করে গিলে ফেলি তাদের জন্য
একফালি চাঁদ তারার শরীর ছুঁয়ে দেয় ভুলে,
আর আধারের গা ভরে উঠে অসুখলতার ফুলে।


বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

জলজ

অম্বুজ বাতাসে পানকৌড়ির মতো
হৃদয়, উড়ে যায় আঁশটে আকাশে।
জলের নীচে ঈশ্বর ছুড়ে মারেন,
অফুরান কষ্টের সসিক্ত মুক্তো
ভেসে ওঠে নীল জীবনের ঘ্রাণ।

এইসব বেঁচে থাকার বোধ
নষ্ট জীবনে বারবার আসে।
বুকের গভীর শীতল অতলে;
মৃত আবেগের তুচ্ছ বুদবুদ,
রক্তজবার মতো জাগে।

ডুবন্ত কথাগুলো টুপটাপ ঝরে,
শিশিরের সুর বেজে ওঠে রাতে
দূরত্বের অমাবস্যা গাঢ় হয়, আর,
শরীরে ঘন হয়ে আসে, অন্ধকার।


মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

তামাকের গন্ধ

লোকটার মানসিক সমস্যা হয়েছে। সারাদিন সে নাকে তুলো দিয়ে বসে থাকে। তুলোয় মেশানো থাকে খাঁটি সৌদি আতর। তাকে যা সৌদির রাষ্ট্রদূত নিজে এনে দিতো নিয়মিত। মাঝে মাঝে লোকটা ক্রমাগত সাবান পানি দিয়ে নাক মুখ ধোয়। সাবানটাও ভালো। পাকিস্তানি সাবান। একসময় উপহার পাওয়া যেত, এখন কিনতে হয়।

কিন্তু কিছুতেই লোকটা গন্ধটা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। কি এক অভিশপ্ত গন্ধ! কি এক অভিশপ্ত জীবন!

তাকে প্রায়ই উঁচু গলায় ডাকতে দেখা যেতো কদিন আগেও। বাড়ির চাকর বাকরদের ডাকছেন "এ্যাই! এ্যাই! আমার বাড়িতে বিড়ি ফুঁকে কোন হারামজাদা! কমজাত! বাদিবাচ্চার দল! গদি নাই তো কি হইছে, এখনো আমার ক্ষমতা জানোস! খুন কইরা পুইতা ফেলবো সবকয়টারে!" ইত্যাদি ইত্যাদি।

চাকর বাকরেরাও বুঝে গেছে এসব বেহুদা চিল্লাচিল্লি। এই অভিশপ্ত প্রায় আধা পাগল বুড়োর কোন শক্তি নেই। শক্তি সহজ জিনিস না। এই যে সামান্য তামাকের গন্ধে বুড়ো ভয় পায়। অথচ কেও কেও নাকি এদেশে ছিলো যারা বারুদের গন্ধকেও বুক দিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছিলো। এখন অবশ্য নেই।

বুড়োকে মাঝে মাঝে দেখা যায় ঝকঝকে সাজে। পাঞ্জাবি পায়জামা কিস্তি টুপি। এ সাজে অবশ্য তাকে দেখতে লাগে সার্কাসের বাদরের মতো। সেই আগের বাদরটার মতো।যে বাদরের ইংরেজি ডুগডুগিতে উপমহাদেশ ভেঙে গেলো সেও তো একটা লম্বা টুপি পরতো। আগের সেই ফালতু দেশের টাকায় টাকায় থাকতো সেই বাদরের কিস্তিটুপি পড়া ছবি। এখন অবশ্য নেই। এখন টাকায় শুধু মসজিদের ছবি। বক-ধার্মিক এক জাতি আবার গড়ে উঠছে। বাদরেরা শকুনেরা হায়েনারা মানুষের মতো হাসছে এখনো। তবু এই সফেদ বাদরের মতো বুড়োর মনে শান্তি নেই।

সে চোখ বন্ধ করলেই দেখে কাওকে কাওকে। বিশাল কেও একজন। ব্যাকব্রাশ করা চুলে যাকে মনে হতো রুপকথার চরিত্র। বুড়ো ঘুমোয় না। তবে মাঝে মাঝে একটা গন্ধ খুব বিরক্ত করে দিনে রাতে সবমসময়। তামাকের গন্ধ। খুব পরিচিত একটা তামাকের গন্ধ। মনে হয় এইমাত্র কেও পাইপ সাজিয়ে প্রথম আগুনের আঁচ নিয়ে সুখটান দিলো। তামাকটা দামি। এলান মোর না কি যেন? লোকটা পাইপ খেত খুব। পাইপ থেকে বেরুনো মিষ্টি-কটু গন্ধে ম ম করতো চারপাশ।

মাঝে মাঝে বুড়োর ভয় বাড়ে এই বুঝি সেই তামাকগন্ধা বিশাল হাতটা এসে পড়ে কাধের উপর। কেও একজন তার মেঘের মতো গাঢ় গভীর স্বরে ডেকে উঠে তার নাম। ভয়ে অস্থির লাগে। সে ডাকাডাকি শুরু করে। আতরে সাবানে সে তামাকের গন্ধ আটকায় না। মনে হয় পাশে বসে তার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে নিশব্দে পাইপ খাচ্ছে কেও! এটা কোন কথা!

বুড়োর চাকর আহমেদের বয়স বেশি না। গ্রামের ছেলে। নিরক্ষর, জানে না সে কিছুই। তবু সে হালকা হালকা আঁচ পায়। বুড়ো একটা বড় পাপ করেছে এককালে। সে কারনে এই অভিশাপগ্রস্ত অবস্থা। রক্তে চুবে উঠেছে বুড়োর রাত্রিদিন। আহমেদ তামাকের গন্ধ পায় নি কোনকালে। তার খুব শখ যে লোকটা তামাক খায় তাকে বাস্তবে দেখার। তার পুরোনো ট্রাংকের তলায় খুব গভীরে লোকটার একটা ছবি লুকিয়ে রাখা আছে। তার বাবা একটা যুদ্ধ করেছিলো তো!তাই তাদের কাছে এখনো এসব ছবি লুকোনো থাকে।

এ দেশে এখন ওসব মহাকায় লোকের ছবি রাখা বারণ। এখন দেয়ালে দেয়ালে ঝোলে উর্দি পড়া ছোট ছোট বাদরের মতো মানুষ। হাস্যকর লাগে তাদের দেখতে।

অভিশপ্ত বুড়ো একদিন মারা যায়।

কিন্তু দেশে আর সুদিন আসে না। আহমেদ বুড়ো হয় একদিন। বুড়ো হবার পর সে শুধু আতরের গন্ধ পায়, পায় সাবানের গন্ধ। সে অবশ্য চিৎকার করে না। সে জানে এই গন্ধ বাস্তব। এইতো গাড়ি দিয়ে গেলো একজন। ফোনে কথা বলতে বলতে একজন। তাদের সবার গা থেকেই আসছে। একদল লোক একটি লোকের সাথে হাত মেলাচ্ছে। তার গা থেকে ভুরভুর করে আসছে সৌদি আতরের সেই পুরানো ঘ্রাণ।

এই লোকগুলোর গায়ে আর এই নষ্ট রাজধানীর রাস্তা ঘাট পার্ক আর অভিজাত অঞ্চল জুড়ে সেই বুড়োর আতরের গন্ধ। দেশের আনাচে কানাচে অনেকগুলো লোক মহাকায় মানুষটার মতো সাজে। তাদের দেখতে লাগে হাস্যকর। লিলিপুট যেন সাজতে চায় গালিভার। তাদের গা থেকে বের হয় পাকিস্তানি সাবানের সেই গন্ধ। আহমেদ টের পায়। তার বয়স হয়েছে। তার টের পাওয়া উচিত।

সে রাস্তায় দেখে মহাকায় মানুষটাকে লোকজন ছোট্ট করে ব্যানারে ফেস্টুনে বন্দি করার খুব চেষ্টা করছে। কালো রঙ দিয়ে হি হি করে হাসতে হাসতে সাজাচ্ছে চারপাশ! যেসব লোকের মনেই নেই লোকটা কে, শুধু প্রতীকের মতো একপাশে রাখতে হয় বলে তারা রাখে মানু্ষটাকে। তাদের ছবিগুলোই এখন আকারে বড়ো। আতরের গন্ধ পাওয়া যায়। সাবানের গন্ধ পাওয়া যায় এসব ব্যানার ফেস্টুন থেকে। আহমেদ পায়। সে হাঁটে রাস্তাঘাট, বন্দর,অফিস, আদালত, স্কুল কলেজ ও প্রান্তর। কোথাও লোকটার কোন অস্তিত্ব নেই। সাবান আর আতরের গন্ধ পাওয়া যায় কেবল। বুড়োটার গন্ধ।

মহাকায় লোকটার ছবি সর্বত্র। সব দেয়ালে ঝুলছে তার ছবি। অথচ ওরা তাকে বন্দি করতে পারে নি সেসব সামান্য ফ্রেমে। কবেই লোকটা এদেশের বিশাল আকাশে মিশে গেছে।

শ্রাবণ শেষ হয়ে গেলেও ঝুরঝুর করে কাঁদে লোকটা।সে কান্না বৃষ্টির মতো হয়েই নামে। মানুষকে বিশ্বাস করে কষ্ট পাবার মতো বেদনা যে আর নেই! পাথরের মতো মানুষটা বুক ফাটা আর্তনাদ করে ওঠে মাঝে মাঝে। মেঘের ডাকে সে আওয়াজ সবাই টের পায় না। আহমেদ টের পায়।

সে টের পায় এ দেশে এখন সব জায়গায় মহাকায় লোকটার ছবি। কিন্তু মানুষটা আসলে নেই। সে নেই কারণ, ব্যানারে ব্যানারে, ফেস্টুনে, তোরণে, তার ছবি থাকলেও কারো বুকের ভেতরে তার জন্য সামান্য যায়গাও এখন নেই। এখন সবাই চায় কিস্তি টুপি পড়ে হলেও চেয়ারে বসতে। দু চার কথা বলতে। নষ্টদের হৃদয়ে মহাকায় মানুষটা থাকতে পারে না। তারা মরসিয়া কাঁদে আজকাল। লাফিয়ে লাফিয়ে খ্যাক খ্যাক করে আড়ালে হেসে সামনে কেঁদে প্রকাশ করে শোক। কি নোংরা তাদের হৃদয়!

এরকম এক নোংরা শোকসভায় গিয়েছিলো আহমেদ একদিন। সেখানে হচ্ছিলো দল উপদলের রাজনীতি। তার দমবন্ধ লাগছিলো। সে পাচ্ছিলো তীব্র আতরের গন্ধ। সে পালিয়েছিলো ওখান থেকে।

আহমেদ বুড়ো হয়ে গেছে। শক্তি কমে আসছে প্রতিদিন। তবু তার টের পাওয়া কমে না।সে টের পায়, দেশটা কেবল ভরে উঠছে সাবান আর আতর মাখা বুড়ো মোশতাকে। তাদের জন্ম হচ্ছে প্রতিদিন।শেখ মুজিব নামের মহাকায় লোকটাকে  বহুকাল আগে আসলেই ঠিকমতো খুন করা হয়েছে। মেরে ফেলা গেছে সমস্ত তামাকগন্ধা হৃদয়।সবার ভেতরে এখন রক্তে চুবানো আতরের সুবাস।

এখন বাতাসে কেবল আতর আর সাবানের পবিত্র ধর্মীয় গন্ধ গাঢ় হয়ে উঠছে। মোশতাকের সংখ্যা বাড়ছে। আর মুজিব? মহাকায় শেখ মুজিব এসব শোকসভায় আসলেই মরে গেছে। তামাকের গন্ধটা এজন্যই কোথাও নেই। কোনদিন পাওয়া যাবে না আর কখনো!















বুধবার, ৯ আগস্ট, ২০১৭

আনন্দ

প্রত্যাখ্যাত দিন আঙুল বুলায়
হারানো রাতের মায়াবী চুলে
আর পায়েসের গন্ধ মিশে থাকে
নিরামিষ সময়ের নীল কাটায়

এইসব দিনরাত শেষ হয়ে যাবে
একদিন বৃদ্ধ সময় এসে, জরাগ্রস্ত
কুচকানো হাতে, খুন করবে আমাদের।
সমস্ত ক্লান্তি নিয়ে আমরা মাটির
অনেক গভীরে শুয়ে থাকবো ঘুমে।

কত হাসি কত কান্না
সব কিছুর কবর হবে স্যাঁতসেঁতে।
ধূসর আকাশের কাক এসে
আবর্জনার মতো খুটে খাবে
আমাদের আশা আর ভালোবাসা।

তবু যতদিন বেঁচে থাকবো
বাঁচার মতো বেঁচে থাকার উল্লাসে,
উড়ুক্কু পায়রার মতো ধোয়াটে,
অমৃত সোমরসে ডুবে ডুবে উড়ে,
ডুবন্ত জীবনে খড়কুটোর মতো
তোমার সোনালী আঁচল ধরে,
জেনো বেঁচে ছিলাম সানন্দে।




মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০১৭

প্লাস্টিক


ঝুমঝুমে আকাশের আদরে,
প্লাস্টিক পৃথিবী ছুঁয়ে ,জল অবিরল,
ধুয়ে দিচ্ছে সমস্ত মানবিক আত্মহনন।
পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া মানুষের ছাই
উড়ে পার হচ্ছে ইতিহাসের পাতা।

আমি এই বদ্ধ ঘরে মহাভারত পড়ি,
শাপ আর অভিশাপে জীবন নির্মল।
ঘোলা বায়ুমণ্ডল জানাচ্ছে মৃত্যু,
বিষাদ ও বিষণ্ণতার রঙ এখনো ধূসর।

নদী খুড়ে মানুষ বের করছে অবাক আলো
ভেজা বালুর মতো জীবন আপাতত ভালো।





সোমবার, ৭ আগস্ট, ২০১৭

নষ্ট

কিছু নিষিদ্ধ যুবক,
ধোঁয়াটে আধারের শব্দবাজ আজ।
আঙুল বাজনা বাজায় না যদিও
গলাও সুর তোলে না কখনো,
কেবল সিলিং টের পায়,
অনবরত কিছু দুঃখ উড়ে যায়।

কাগুজে অক্ষর অন্ধ শালিক হয়ে
চাঁদের ভেতরে কবিতা পড়ে একা
সমস্ত মৃত কবিদের এক সম্মেলন
কেউ আসে না পাখিদের খোঁজে।


কারো সাথে কেও নেই,
কারো পাশে কেও নেই,
সবাই যার যার মতো বদ্ধ ঘরে,
আলপনা আঁকে নষ্ট রঙে!
শব্দ সাজায় নতুন ঢংয়ে!
সুর তোলে, লয় তাল সম,
করুণ গান্ধার কেঁদে মরে।

শেষমেষ মানুষটা ফাঁকা রাস্তায়,
একা রিকশায় জলন্ত আগুন,
কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো ফোটে।
ভেজা শিউলির মতো কিশোরীরা
বিক্রি হয় ল্যাম্পপোস্টের নীচে।

তাদের দাম ফুলের চেয়েও কিছু কম
সুখ নামের প্রেমিকেরা পালিয়েছে
কালো আকাশে জোছনা মরেছে কখন!
বুকের খাজে এখন,ভাত আর দাঁতের জখম।  

শনিবার, ৫ আগস্ট, ২০১৭

চায়ের চিঠি

ভালো আছো?
খুন হওয়া সন্ধ্যায় কড়া স্বপ্নের চা,
বিষণ্ণ করোটি ঝিম ধরিয়ে রাখে এখনো?
মনে হয় নিজস্ব বাস্তবতায়, ঘুমন্ত বিকেলে
আজও আত্মাহীন মানুষের ভীড়ে একা?

অথচ আমরা বেঁচে ছিলাম,
ফুটন্ত পানির টগবগে গোলাপে
তুমি হয়ে উঠেছিলে কড়া লিকার।
শারীরিক চিনির রসায়নে,
প্রেমের তীব্র আলোড়নে,
ভাগ্যের চামচ আমাদের নাড়ালে,
ফুরোতো সমস্ত নিষিদ্ধ আশা।

আজ বরং থাক সেসব কথা!
বাস্তবের কেটলিতে ডুবে মরুক
জীবনের কাল্পনিক ভালোবাসা।



সোমবার, ৩১ জুলাই, ২০১৭

যুদ্ধ

মানুষ আর প্রেম কেও আমার হয় নাই।
আমি ভালোবেসেছিলাম ওদের দুজনকেই
ওরা এভাবে নির্লজ্জ প্রত্যাখান করলো,
আর ছুড়ে ফেলে দিলো আল্পসের করোটিতে

আমি গড়াচ্ছিলাম, নেমে আসছিলাম
মাটির খুব কাছাকাছি সোদা গন্ধে
আমার ঘুম নেমে আসছিলো চোখে
আমি ওদের উপেক্ষা করলাম আরামী বিষাদে।

বরফের কুচিকণারা আমার চোখ ঢেকে দিচ্ছিলো,
অনেক আগের কিসব যুদ্ধে মৃত জমাট সৈনিক
আমাকে বলে দিচ্ছিলো বারবার, কেও বেঁচে নেই।

অথচ একদিন বার্চ আর পাইনের জংগলে ওরাই
আগুন গরম কফির মগ চেপে ধরেছে বুকে
মানুষ যে উষ্ণতা ভুলে গেছে তার সন্তনা পেতে।
এখন মরচের মতো জমে আছে বেয়নেটের ফলায়
তুষারের চাদর গায়ে দিয়ে মাটির গভীর জঠরে।

আমরা ভুলে গেছি অরণ্যের ডাক
ভুলে গেছি পাহাড় আজও গায় আত্মার ভিতরে।
ঝর্ণা অবাক হয়ে জাগে আবছায়ায়, অন্ধকারে।
ভুলে গেছি আমাদের অন্তরে অচীন মানুষ ডাকে।

ফিরে আয়,ফিরে আয়
রক্তের গহীন থেকে ডাকে ভবঘুরে জীবন।
অরণ্য অভিমান করে মুখ ঘুরিয়ে নেয়
প্রেমিকেরা সব ধর্ষণ করে ফেলে গেছে তাকে।

রবিবার, ১৪ মে, ২০১৭

পুঁথিগন্ধা রোদ

রোরুদ্যমান দুপুরে
এক একটা দিন ঝড়ের অপেক্ষা করি
ধানের পোকারা সোঁদা গন্ধ নিয়ে
চক্রাকারে ঘোরে

কোমল হলুদ ধানের গুচ্ছে
ছেলেবেলার সুর ছড়িয়ে আছে
পুঁথির গানের মতো রক্তে মেশে
ভাতঘুমে আমার চোখ ঝিমিয়ে আসে!

কাঁচা আম কুচি কুচি করে
নুন মরিচের লোনা লাল মিশিয়ে
অনেকটা ভালোবাসা মেখে রেখো
জানলা দিয়ে আসা রোদের মতো
হুট করে আমি ফিরবো একদিন।

বৃহস্পতিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

কুয়াশার কিশোরী

কুয়াশা নামা পৌষের রাতে আমার কষ্টগুলো,
কি করে যেন, একরাশ ভেজা শিউলি হয়ে ওঠে।
আর একান্ত আধারে, নির্বেদ ঘুমের অনুতাপে,
 ঝরে যায়, আমাদের ভুল ভালোবাসার মতো।

যে কিশোরী তার কোমল তালুতে তুলেছিলো,
সেসব বিচ্ছিন্ন ফুলেল দু:খ, তাকে কেবল মনে পড়ে।
মিহি মেঘের সাদা চাদর গায়ে সে কাঁপছিলো শীতে
পাজরে তার শুভ্র হিম নামছিলো ফেননিভ আদরে।

মায়াবীর সে দেশে ছাই রং ভোরে রাত ঘুম স্বপ্ন হয়।
কিশোরী ফুল কুড়োয়,আকাশ সাদা হবার অপেক্ষায়,
কিন্তু অপেক্ষা ফুরোবে না, এ রাত তো শেষ হবার নয়।
এ দেশে অনন্ত রাত্রির অভিশাপ জলের শব্দে ঘুমোয়।

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

হারানো বিজ্ঞপ্তি

অপলা বলেছিলো দশ আঙুলে রং মেখে,
এলোচুলে ফিরবো, তোমার সাদাকালো দেশে।
আমার রং গুলো অভিমান করে রইলো সারাদুপুর
রোদেরাও অপেক্ষায়, তার আর ফেরার নাম নেই।

একটা নীল স্বপ্নের ট্রেনে সে ফিরবে বলে,
অন্ধ অজগরের মতো ট্রেনেরা ওকে খুঁজেছে।
প্রতি জানলায় কাতর, অসহায় সব বিজ্ঞপ্তি।
অথচ ফেরার কথাটা বলে ও হারিয়ে গেলো।

সময়কে খুন করে তাই, কাঁটায় ভেজাই রক্তজবা
টিক টিক শব্দের ঘূর্ণিতে, মুহূর্তের সোল্লাস আত্মহত্যা,
শুধু তুমি নেই বলে এ দেশে প্রণয় বে-আইনী আবার।
প্রতিটি কবিতা এখন একান্ত ব্যক্তিগত নিষিদ্ধ ইশতেহার।

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৫

সপ্তপদী

এসো, এবার গোল হয়ে বোসো।
মনের দু:খ জ্বালাও ঠোটের ভাজে,
পাত্তরের বুক ঘুরে আসুক সোমরস
ক্ষমাহীন আঘ্রাণের এ মাতাল চাঁদে।

আকাশের অকথ্য কষ্ট মরুক চুপচাপ ডুবে
সাথে নিয়ে সপ্তপদীর পায়ে জমা জন্মান্ধ বেদনা
মনের অন্ধগলির বাঁকে নীল, আজ নির্ভুল জোছনা! 

বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৫

আত্মসমর্পণ

ভীত হরিণ শাবকের মতো একটা রাস্তা ধরি
পেছনে তাকাই না আর, সামনেও দেখি না
পেছনের পথটুকু মাখা মরা শিউলির গন্ধ
আর সামনে চৈত্রের করাল খাণ্ডবদাহন
তাই হোঁচট খাই আর স্বপ্ন দেখি,
তোমাদের দেখি না।

তোমাদের দেখলে আসলে বড়ো ভয় পাই
কত নিশ্চিন্ত হয়ে  হাটো, হাত-পা নাড়ো।
কি চমৎকার বলে ফেলো, 'ভালোবাসি'!
আর আমি,শব্দটার মানে খুঁজতে পথে নেমে,
 হনহন করে নিজেকেই হারিয়ে ফেলি।

মনের কোমল কোঠরের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে
সমস্ত আলোচনা শেষে, সই করি আত্মসমর্পণ।
দু:খের দাগটা মুছে ফেলি,করুণ আঙুলে।

শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৫

সস্তা হোটেলে মধ্যাহ্নভোজ

কয়েকটা টেবিল ইতস্তত বসে, বিচ্ছিন্ন প্রণয়ীর মতো
হঠাৎ দেখা হবার কুন্ঠা নিয়ে, আপাতত লজ্জিত।
চেয়ারেরা যেন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদলের পুনর্মিলন,
যেখানে পুরোনো ভাগের সিগারেট স্বাদটা আর নেই।

প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের মতো লাল সস্তা বোকা জগটা
অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে, ডাকলেই ফিরবে না আর।
লোহা রং লাগা মলিন গ্লাসগুলো পচে গেছে
ভালোবাসাহীন ঠুনকো সম্পর্ক ছুঁয়েছে ওদের বুক।

সুখ আসলে এক থালা ধোয়া ওঠা গরম ভাত, পাইনি।
ঠাণ্ডা ভাতের জীবনে দু:খের ঝোলটুকু মেখে খেয়ে নেই।
কড়া রোদের মতো ঝালে,পোড়া চোখে জল আসে
আসলে কেউ তো বলার নেই, "আর দুটো ভাত দেই?"

প্যালিওলিথিক স্বপ্ন

 খানিকটা আকাশ অন্ধগলির চোখে চুপ,
গনিকার আদরের মতো পবিত্র এ সকালে।
পীচরাস্তার ছটফটানিতে, ইচ্ছে হয়  
 আবার প্যালিওলিথিক যুগে ফিরে যাই।

এ শহরে অরণ্য নেমে আসুক,  
প্রতি পদক্ষেপে জন্ম নিক, হিংস্র সব শ্বাপদ।
অন্তরে ঘিরে সবুজাভ আধারীর ভয়
আর অনিশ্চিত প্রশ্বাস থাকুক, আমাদের বুকে।

আর একবার ফিরে যাই, আমরা ভয়ের কাছে,
যে ভয় আমাদের আচ্ছাদন, আমাদের আশ্রয়।
মরে যাবার ভয় নেই বলে, বাঁচতে শিখি নি
ছোটার তাড়া না থাকায়, কেবলই ভুল পথ
গোড়ালির নিচে জমে যায় আর থামে।

পরস্ত্রীর গন্ধের মতো আগুন লাগা সন্ধ্যা,
রক্তাভ হয়ে কার্তিকের নীলে গিয়ে মেশে।
রং, আমাদের অবাক না করে আর,
নিয়ন আলো জ্বালিয়ে দু'চোখে
কবোষ্ণ মাংসপিণ্ড মাপতে বসি আবার।  

এ নিষিদ্ধ শহরে কবরের মাছিরা ওড়ে,
লালাভ রক্ত গালে মেখে পরীরা নেমে আসে
কোমল আধারে। আমরা সে পরীর ডানা ছুয়ে
পবিত্র হবার পরেও নষ্ট হতে ভয় পাই।

রাত্রির সাথে প্রণয়কলহ  তুমুল হলে,
আকাশে জাগে কৃষ্ণা অষ্টমীর ভীত চাদ।
আমরা আধো ঘুমে মানুষীর স্বপ্ন দেখি,
কবিতার মত নষ্ট সব স্বপ্ন, গদ্যের অক্ষরে।

স্বপ্ন আমাদের টানে, কাঁটার উজানস্রোতে
করুনায় আদ্র সব গোলকে আমরা ডুবে যাই
আমরা তীব্র হই ভাদ্রের লুব্ধকের মত মেতে।

আমাদের আক্রান্ত শরীরের চক্রান্ত ঘুমুলে,
আমরা স্বপ্ন ভেঙ্গে সভ্য হই, দুপুরে সকালে
ঈশ্বরের পৃথিবীতে ডুবন্ত আলোড়ন তুলে।

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০১৫

গুরুচণ্ডালী (পাদুকার প্রত্যাবর্তন )

বহুকাল পরে( তা মাসখানেক তো হইবেই) যখন স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিলাম তখন রীতিমত সাড়া পড়িয়া গেলো। মাতা ও ভগ্নীরা দহলিজের বাহির হইতেই আপাদমস্তক জরিপ করিতে লাগিলেন। মস্তকের ইস্ক্রুপ ঘটিত সমস্যাদি তাহারা জানিতেন বলিয়া খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না। তবে পদদ্বয় দেখিয়া মাতা ফুকারিয়া কাদিয়া উঠিলেন আর ভগ্নীদের মুখও চুন হইয়া গেলো।  কারনটি সামান্যই, পায়ে একজোড়া নিন্মবর্গীয় পাদুকা।

ঘটনাখানি এরুপ, মাতা ইতিপূর্বে অর্থাদি প্রেরন করিয়া বারংবার একজোড়া সুদৃশ্য পাদুকা ক্রয় করিয়া এ পুত্রকে নিজের পদোন্নতি করিতে আজ্ঞা করিয়াছিলেন। আমি কুপুত্র তাহা নয়ে ছয়ে চুয়ান্ন করিয়া ফেলিয়াছি। এদিকে কত রাম ,শ্যাম ,রহিম, করিম, যে বহুমূল্য পাদুকা পড়িয়া মসমসাইয়া চলিয়া পটপটাইয়া কথা কহিয়া দুনিয়া ভাজিয়া খাইলো তাহা বলিতে বাকি রাখিলেন না।বুঝিলাম, মস্তক যে চুলোতেই যাক উহাদের পদোন্নতি হইতেছে এবং হইবে। এদিকে তাহার 'লাল' ই কেবল মুখচোরা রহিল গো! রাজ্যের পুঁথি পড়িয়া  ইহার মস্তক বিগড়াইয়াছে। মস্তক ছাড়িয়া পদের যে কিছু করিবেন তাহাও দুরাশা। যে বাহ্যে যাবার নিচুজাত পাদুকা পড়িয়া ভ্রমনে বাহির হয় তাহার জীবনের আশায় ঢ্যারা পড়িয়াছে ইহা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

ইত্যবসরেই আমি যে কিরুপ কালকাশ  সদৃশ রোগা হইয়া গিয়াছি এবং আমার গৌরবর্ণ (!)  রং কিরুপ পুড়িয়া গিয়াছে উহারা তাহা লইয়া পড়িলেন। একদিকে আমি ভীমের মত খাইয়া আর কুম্ভকর্ণ এর ন্যায় নিদ্রায় স্ফীতোদর হইয়াছি। অন্যদিকে জন্মান্তেই যে কয়লাকান্তি রুপ লইয়া জন্মিয়াছি তাহারও কোনরুপ ক্ষয় হয় নাই। মনে মনে কহিলাম "আমি কালো হইয়া যাই নাই, কালো থাকিয়া গিয়াছি, এই যা।"ইহাতে এরুপ কোলাহলের কি আছে! বুঝিতে না পারিয়া মৌন হইলাম।

কেবল নিজের কথাই বলিতে এই খটমটে গুরুচন্ডালী খুলিয়া বসি নাই তাহা বলিলে মিথ্যাচার হইবে। এ আমার একান্ত নিজস্ব কথন।  ভালো না লাগিলে দূরে গিয়া মুড়ি ভক্ষন করিলেই খুশি হইবো।

এইবারের যাত্রাখানা বড় অম্লমধুর ছিলো সে ব্যাপারে সন্দেহ নাই। প্রথমত,  শ্যালকের পুত্ররা লিখিত পরীক্ষায় নানা রকম ফ্যাকড়া বাধাইয়াছিলো। সময়সূচী দেখিলেই উহাদের খুরে প্রনাম জানাইতে হয়। দিতীয়ত পেশাগত পরীক্ষায় নানা পেশা অবলম্বন করিতে হয় (চৌর্যবৃত্তি, নকলনবিশি ইত্যাদি)। এই মহাসত্য জানিয়াও  দুই শশ্রুমন্ডিত বারবনিতার পুত্র আমাদের মহাযজ্ঞে বাগড়া দিয়াছিলো। তাহাদের বিচার ঈশ্বর করিবেন। গায়েবী ও পার্শ্বীয় সহযোগীতায় গোটা চারেক কুম্ভীপাক পার হইলাম।

তবে সর্বশেষ পরীক্ষায় সে এক পরিস্থিতিরই উদ্ভব হইলো। আজও গা শিহরিয়া উঠিতেছে। পূর্বদিনে প্রশ্নপত্র আগমনীর বাজনা উঠিলো বাজি। সে বাদ্যে আনপড় নাচুনে বুড়ো বুড়িরা ঝাপাইয়া পড়িয়া 'নাচমেঝে' কাপাইয়া দিলো। আমার কক্ষবন্ধু  'মহাধিনায়ক নিধিরাম' অগ্নিতে নুন ঘৃত দিয়া জনতার উল্লাসকে  উৎসবে পরিনত করিয়া দিলো। আরেক কক্ষবন্ধু 'কুম্ভকর্ণ' দিবারাত্র দক্ষিণী ছায়াছবি দেখিয়া আর নিদ্রা যাইয়া সকলের অধ্যয়নাদি দু:সাধ্য করিয়া তুলিলো।

তাতে অবশ্য লাভ বিশেষ হইলো না।

রাত্রির শেষ প্রহরে মহাধিনায়ক  মুঠোফুন মারিতেই প্রশ্নবাবা কহিলেন " খোকা,প্রশ্ন তো  বাঘ শিকারে সুন্দরবন গিয়াছে। ফিরিলে সাক্ষাৎ হইবে।"

মহাধিনায়ক শিরে আঘাত করিয়া ক্ষীন আওয়াজে কহিলো "হইলো না" ইহার পর বিভীষনজাত সহপাঠিনীকুল আর প্রশ্নবাবার প্রতি যেসব 'মধুর' বাক্য প্রয়োগ করিলো তাহা সে কলাপ মুগ্ধবোধে শেখে নাই তাহা বলাই বাহুল্য।

নিদ্রিত  ছাত্রজনতা জাগ্রত হইয়া হু হুংকারে কাদিয়া উঠিল, 'হায়! তাহারা কি এই দেশ চাহিয়াছিলো। যে দেশে সামান্য প্রশ্নফাঁস এর নিশ্চয়তা নাই সে দেশের হইবে কি!"

 যাহাই হোক বিভিন্ন পেছনের দরজা ব্যবহার করিয়া প্রথম পরীক্ষার মুখাগ্নি আর শেষখানার পশ্চাৎ ছারখার করিয়াই  বাহির হইলাম।

মুক্তকেশ হইয়া স্বগৃহে ফিরিব। আমার  বন্ধুবর , যিনি এ মহাবিদ্যালয়ের অন্যতম 'উর্বশীর অভিশপ্ত অর্জুন', তিনিই যাত্রার ব্যবস্থা করিলেন। পরে জানিলাম , হায়!আমার সর্বনাশ হইয়াছে।ভয়ে প্রান উড়িয়া গেল। এ দেখি 'হংস মধ্যে গুগলি যথা' বিচরন করিতে হইবে। যাহাকে দেখিলে বায়ুস্তরের সমস্ত অম্লজান উড়িয়া যায় বলিয়া মনে হয় তাহার সহিত যাত্রা করা, নৈব চ নৈব চ। কিন্তু ইহার  কারন আজও খুঁজিয়া পাইলাম না।কম তো ভুগাইলো না।মগজকে প্রশ্ন করিলে কহে ''রসো কাকা,অনুসন্ধান চলিতেছে।'' তাইতে আবার সংগী আরেক সহপাঠী 'বিচিত্রবীর্য' । এ দুইয়ে মিলিয়া আমার 'পা টানিয়া' রংগ রহস্যে আর কিছু রাখিবে না। দমাদম মানসিক আছাড় খাইবো।

এদিকে বন্ধুরূপী শত্রু বুরবকদিগকে যাহাই বলি না কেন তাহা লইয়াই ইহারা রঙ্গ করিয়া সারা হয়। আমি উহার প্রেমে পড়িয়া হাবুডুবু খাইতেছি এই প্রচারে ইহারা অক্লান্ত।  মনে মনে কহি "প্রেম ফ্রেম হইলে তো বাঁচিয়াই যাইতাম। দর্শনের  লাইফবোট খরিদ করিয়া তীরে আসিয়া প্রেমকে মুখ ভ্যাংচাইতাম।উহা আমি ভালো পারি। যাহা হইয়াছে তাহা পাভলভ, ফ্রয়েডে ব্যাখা করিতে হয়। জ্ঞানও নাই সাহসও হয় না। ব্যাখা করিতে গেলে ঠ্যাঙানী খাইবার সম্ভাবনা অতি উচ্চ। তবে তত্ত্ব যুক্তি শুনিতে ইহারা রাজি না। অঙ্কও বোধহয় কম শিখিয়া থাকিবে।অমুক যোগ তমুক করিতেই ইহাদের উৎসাহ। এ শালারা বিয়োগ জানিলে বড় ভালো হইতো। সব হইতে আমাকে বিয়োগ করিলেই খুশি হইতাম।"

যাহাই হোক এ আকাঁড়া বাজারে কে টিকিট ক্রয় করিবে? আমার  কোন শ্যালক! 'যা থাকে ললাটে' বলিয়া  যাত্রা করিলাম।

উহারা যথাবিহিত যত্নপূর্বক আমার মানসিক দেহের সৎকার করিলেন। মানে যেটুকু অবশিষ্ট রহিল তাহা অকিঞ্চিৎকর। পরে পারাপারের  জলশকটে চড়িয়া নানা কায়দায় নিজস্বী তুলিতে ব্যতিব্যস্ত হইয়া গেলেন। চোখ বুজিয়া আমিও কয়েকটিতে চলিয়া আসিলাম। (ষড়যন্ত্র এর ফল, আর এমনিতেই আমার চৈনিক চক্ষু)।মুখপঞ্জিকায় বিস্তর হাসাহাসি হইল। দেখিয়া দু:খে দার্শনিক হইয়া গেলাম।

যাহাই হোক, শেষমেষ আসিয়া পৌঁছাইলাম শৈশব সমাপ্তির শহর ঢাকায়। যাদুর শহর, যে শহর অদ্ভুত মন্ত্র পড়িয়া আমাকে টুকরা টুকরা করিয়া জীবনপথে ছুড়িয়া ফেলিয়াছে। যে শহরে একটা ছেলে বড়মানুষদের ভীড়ে হারাইয়া ক্রমাগত নিজেকে খোঁজে।তার স্বপ্নগুলো অলিতে গলিতে অন্ধ ভিখিরীর মতোন বস্তবের কাছে হাত পাতে। মাধুকরীর এ জীবন বড় অসহ্য লাগে সময় সময়।

পাদুকার কথায় ফিরিয়া আসিতে হইতেছে। আশৈশব খালি পায়ে দৌড়াইয়া বেড়াইয়াছি। পথে ঘাটে অলিতে গলিতে খেলিয়া ঘুড়ি উড়াইয়া, লাটিম ঘুরাইয়া দিন পার হইয়াছে। হতদরিদ্র সে শৈশব খুব খারাপ ছিল বলিলে মাথায় বজ্রাঘাত হইবে।

শৈশব ছিল বিস্ময়। বনদেবীর আঁচলের তলায় যে শৈশবের শুরু তাতে চিন্তার প্রসারতা ছিলো। সত্যিকার বন্ধুরা ছিলো।তাহারা কে কোথায় হারাইয়া গেলো আর খুঁজিয়াই পাইলাম না।  টাকা- ক্ষমতার লড়াই,ফটকাবাজির ধাধা,  অন্যকে ছোট করিয়া নিজে বড় হইবার প্রাণান্তকর চেষ্টা এসব ছিলো না।কয়েক দিগন্ত ফিরোজা নীল আকাশ ছিলো, মাঝদুপুরে স্কুলপালানো বনঝোপের সবুজ ছিলো। এখনকার অনেক পরিচিতকে দেখিলে নিজের উপরই বিবমিষা জাগে। আমিও বোধকরি ইহাদের মতোই হইয়া গিয়াছি। তবে এটুকু সত্য, যাদের আজকাল বন্ধু বলিয়া জানি তাহাদের অনেকেই মনের সদর দরজাও পার হইতে পারে নাই। অন্তরে প্রবেশের রাস্তাটা কি শৈশবেই বন্ধ হইয়া যায়?

তা না হইলে এর পরের সমস্ত সম্পর্ক কেমন যেন মেকি বোধ হইতে থাকে কেন? কেন আমাদের এ সমাজে, এ অদ্ভুত উটের দেশে মানুষের দাম এতো কম? পরিধেয় কেন ঠিক করে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের আচরন?

জীবনে প্রশ্নবোধকের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়িতেছে।

মনে করিয়াছিলাম এ খটমটে পাতায় কেবলই রামগরুড় এর সহাস্য কথন থাকিবে। তা আর হইলো কই। এমনিতে কিন্তু আমি হাস্যকর একজন মানুষ। কেনো যেন মনে হয় ঠিকঠাক বড় হইয়া উঠিতে পারি নাই। সেই ছোট্টটিই রহিয়া গেছি।ইংরাজিতে তোমরা যাহাকে বলো 'Adult' বা 'Grown up' তাহা হইতে পারিলাম কই?  চিন্তা সাবালক নহে তাই আচরনও জলের মতো। নির্দিষ্ট আকার নাই।  ব্যক্তিত্ব, আত্মসন্মান, সামাজিকতা, ভদ্রতা এ সমস্ত শব্দের অর্থ এখনো মর্মে  প্রবেশ করে নাই। তাই এখনো কতকটা খাপছাড়া, উল্টো কাছিমের মতো জীবনের আকাশ দেখিয়া বিস্মিত হই। দিগন্তের গায়ে অংশুমালীর যে কিরণ মেঘে মিশিয়া নানা রঙ ফুটাইয়া তুলে তাহা ছানিতে চাই। গগের গমখেতে চুপচাপ ঘুরিতে চাই।

চাহিদার তালিকায় দামী পাদুকাজোড়া ক্রমশ নিন্মগামী হয়।আমার দোষ নাই।

সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০১৫

একটা গল্পের গল্প



গল্পটার তখনো অনেকটা বাকি,
আমরা দুজন চুপচাপ, মুখোমুখি,
ফ্রিজ শটে স্থির।
 ইতস্তত হেলে যাওয়া জানালা
উড়ে যাচ্ছিল, কাকের ডানায়,
উল্টো কাছিমের বালুকাবেলায়।

শুরুটা হলো ছোটগল্পের মতোন,
অবাস্তব সব উপমার ছড়াছড়ি।
আমি মন দিচ্ছি তোমায়,
তুমি উপমায়।

একের পর এক শব্দ কুড়িয়ে
আমাদের গল্প এগোয়।
কথাগুলো ধোঁয়াশার মতো
আস্তে আস্তে জমে উঠে কুয়াশায়।

আনমনে তুষারপাত  কিছুতেই হয় না।
এ দেশে এখনো বৃষ্টি, কালো মেঘ,
সাদা আলোর আচমকা ঝলক,
অন্ধ জাহাজীর অনন্ত অপেক্ষা।

আমাদের স্বপ্নে একটাই তুষারঝড়।
সে জন্য আমরা অপেক্ষা করি
গোটা একটা জীবন।

গল্পের মধ্যমায় পৌঁছে আমরা টের পাই
এখন,অশীল অন্যমনস্কতা আমাদের
এক করে রাখে।
মৃতবৎ সংলাপ সব ঘিরে ধরে বাহুপাশ,
আমরা নির্বাক হই।

গল্প শেষ করার ইচ্ছে আর হয় না।
আমরা ক্রমাগত বাসি হয়ে যাই।
আমাদের শব্দে ভাসে
মাংসপচা গন্ধ।

অথচ  তোমার শব্দগুলো, অজস্র তারা ছিলো
যাদের পথক্লান্ত আলো, মাত্র এলো।
গ্রহ আর গ্রহান্তরের অগ্রন্থিত কাব্য ছিলো
যাদের দূরত্ব, সমস্ত কবিতার ছন্দ
অথচ আমাদের ছিলো অবাক ধুমকেতু প্রেম,
যে বারবার ফিরে আসে
প্রথম কিশোরীর মুখের মতোন।

শেষমেষ আমরাই নষ্ট করে দিলাম সব
আমাদের চারপাশে অগুনতি অনূভুতির শব।
এখন আমাদের অনেক নষ্ট দিয়ে,
অকালমৃত পুতুলের বিয়ে।

অবান্তর কিছু  আওয়াজ
ঘিরে থাকে চারপাশ।

রক্তের রঙ ফিকে হয়ে গেলে
যে প্রদোষে ফুটেছে কদম,
তার মতো মরে যেতে যেতে
আমরা ভালোবাসি।